ইস্পাত পাতের বৈশিষ্ট্যের উপর রাসায়নিক উপাদানের প্রভাব
যে লোহা-কার্বন সংকরে কার্বনের পরিমাণ ২.১১% এর কম থাকে, তাকে ইস্পাত বলা হয়। লোহা (Fe) এবং কার্বন (C)-এর মতো রাসায়নিক উপাদান ছাড়াও ইস্পাতে অল্প পরিমাণে সিলিকন (Si), ম্যাঙ্গানিজ (Mn), ফসফরাস (P), সালফার (S), অক্সিজেন (O), নাইট্রোজেন (N), নাইওবিয়াম (Nb) এবং টাইটানিয়াম (Ti) থাকে। ইস্পাতের বৈশিষ্ট্যের উপর সাধারণ রাসায়নিক উপাদানগুলির প্রভাব নিম্নরূপ:
১. কার্বন (C): স্টিলে কার্বনের পরিমাণ বাড়লে এর ইয়েল্ড স্ট্রেংথ (yield strength) এবং টেনসাইল স্ট্রেংথ (tensile strength) বাড়ে, কিন্তু এর প্লাস্টিসিটি (plasticity) এবং ইমপ্যাক্ট স্ট্রেংথ (impact strength) কমে যায়; তবে, যখন কার্বনের পরিমাণ ০.২৩% ছাড়িয়ে যায়, তখন স্টিলের ঝালাইযোগ্যতা (weld-ability) হ্রাস পায়। তাই, ঝালাইয়ের জন্য ব্যবহৃত লো অ্যালয় স্ট্রাকচারাল স্টিলে কার্বনের পরিমাণ সাধারণত ০.২০% এর বেশি হয় না। কার্বনের পরিমাণ বাড়লে স্টিলের বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায় এবং উচ্চ কার্বনযুক্ত স্টিল খোলা বাতাসে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এছাড়াও, কার্বন স্টিলের কোল্ড ব্রিটলনেস (cold brittleness) এবং এজিং সেনসিটিভিটি (aging sensitivity) বাড়িয়ে তুলতে পারে।
২. সিলিকন (Si): ইস্পাত তৈরির প্রক্রিয়ায় সিলিকন একটি শক্তিশালী ডিঅক্সিডাইজার, এবং কিল্ড স্টিলে সিলিকনের পরিমাণ সাধারণত ০.১২%-০.৩৭% থাকে। যদি ইস্পাতে সিলিকনের পরিমাণ ০.৫০% ছাড়িয়ে যায়, তবে সিলিকনকে অ্যালয়িং এলিমেন্ট বা সংকর উপাদান বলা হয়। সিলিকন ইস্পাতের ইলাস্টিক লিমিট, ইল্ড স্ট্রেংথ এবং টেনসাইল স্ট্রেংথ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে এবং এটি স্প্রিং স্টিল হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কোয়েনচড এবং টেম্পারড স্ট্রাকচারাল স্টিলে ১.০-১.২% সিলিকন যোগ করলে এর শক্তি ১৫-২০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। সিলিকন, মলিবডেনাম, টাংস্টেন এবং ক্রোমিয়ামের সাথে মিলিত হয়ে এটি ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে পারে এবং তাপ-প্রতিরোধী ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। ১.০-৪.০% সিলিকনযুক্ত নিম্ন কার্বন ইস্পাত, যার চৌম্বকীয় ভেদ্যতা অত্যন্ত বেশি, বৈদ্যুতিক শিল্পে ইলেকট্রিক্যাল স্টিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সিলিকনের পরিমাণ বাড়লে ইস্পাতের ওয়েল্ড-এবিলিটি বা ঝালাইযোগ্যতা কমে যায়।
৩. ম্যাঙ্গানিজ (Mn): ম্যাঙ্গানিজ একটি ভালো ডিঅক্সিডাইজার এবং ডিসালফারাইজার। সাধারণত, স্টিলে ০.৩০-০.৫০% ম্যাঙ্গানিজ থাকে। যখন কার্বন স্টিলে ০.৭০% এর বেশি ম্যাঙ্গানিজ যোগ করা হয়, তখন তাকে "ম্যাঙ্গানিজ স্টিল" বলা হয়। সাধারণ স্টিলের তুলনায়, এতে কেবল যথেষ্ট দৃঢ়তাই থাকে না, বরং এর শক্তি এবং কাঠিন্যও বেশি থাকে, যা স্টিলের কাঠিন্য বৃদ্ধি এবং গরম অবস্থায় কাজ করার ক্ষমতা উন্নত করে। ১১-১৪% ম্যাঙ্গানিজযুক্ত স্টিলের ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি, এবং এটি প্রায়শই এক্সকাভেটর বাকেট, বল মিল লাইনার ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে স্টিলের ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঝালাইয়ের কার্যকারিতা কমে যায়।
৪. ফসফরাস (P): সাধারণভাবে বলতে গেলে, ফসফরাস স্টিলের একটি ক্ষতিকর উপাদান, যা স্টিলের শক্তি বৃদ্ধি করে, কিন্তু এর নমনীয়তা ও দৃঢ়তা কমিয়ে দেয়, স্টিলের শীতল ভঙ্গুরতা বাড়িয়ে দেয় এবং এর ঝালাই ও শীতল নমন কর্মক্ষমতা হ্রাস করে। তাই, সাধারণত স্টিলে ফসফরাসের পরিমাণ ০.০৪৫%-এর কম হওয়া প্রয়োজন এবং উচ্চ-মানের স্টিলের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনীয়তা আরও কম থাকে।
৫. সালফার (S): সালফারও সাধারণ পরিস্থিতিতে একটি ক্ষতিকর মৌল। এটি ইস্পাতকে উত্তপ্ত অবস্থায় ভঙ্গুর করে তোলে, ইস্পাতের নমনীয়তা ও দৃঢ়তা কমিয়ে দেয় এবং ফোরজিং ও রোলিংয়ের সময় ফাটল সৃষ্টি করে। সালফার ঝালাইয়ের কার্যকারিতার জন্যও ক্ষতিকর এবং ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই, ইস্পাতে সালফারের পরিমাণ সাধারণত ০.০৫৫%-এর কম থাকে এবং উচ্চ-মানের ইস্পাতে তা ০.০৪০%-এর চেয়েও কম হয়। ইস্পাতে ০.০৮-০.২০% সালফার যোগ করলে এর মেশিনিং-যোগ্যতা উন্নত হয়, যাকে সাধারণত ফ্রি-কাটিং স্টিল বলা হয়।
৬. অ্যালুমিনিয়াম (Al): অ্যালুমিনিয়াম স্টিলে বহুল ব্যবহৃত একটি ডিঅক্সিডাইজার। স্টিলে অল্প পরিমাণে অ্যালুমিনিয়াম যোগ করলে এর দানার আকার সূক্ষ্ম হয় এবং ইমপ্যাক্ট টাফনেস উন্নত হয়; এছাড়াও অ্যালুমিনিয়ামের জারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। ক্রোমিয়াম এবং সিলিকনের সাথে অ্যালুমিনিয়ামের সংমিশ্রণ স্টিলের উচ্চ-তাপমাত্রার পিলিং পারফরম্যান্স এবং উচ্চ-তাপমাত্রার ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। অ্যালুমিনিয়ামের অসুবিধা হলো এটি স্টিলের হট ওয়ার্কিং পারফরম্যান্স, ওয়েল্ডিং পারফরম্যান্স এবং কাটিং পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করে।
৭. অক্সিজেন (O) এবং নাইট্রোজেন (N): অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন হলো ক্ষতিকর মৌল যা ধাতু গলানোর সময় চুল্লির গ্যাস থেকে প্রবেশ করতে পারে। অক্সিজেন ইস্পাতকে উত্তপ্ত অবস্থায় ভঙ্গুর করে তুলতে পারে এবং এর প্রভাব সালফারের চেয়েও বেশি গুরুতর। নাইট্রোজেন ইস্পাতের শীতল অবস্থার ভঙ্গুরতাকে ফসফরাসের অনুরূপ করে তুলতে পারে। নাইট্রোজেনের এজিং প্রভাব ইস্পাতের কাঠিন্য এবং শক্তি বাড়াতে পারে, কিন্তু এর নমনীয়তা এবং দৃঢ়তা কমিয়ে দেয়, বিশেষ করে বিকৃতিজনিত এজিং-এর ক্ষেত্রে।
৮. নাইওবিয়াম (Nb), ভ্যানাডিয়াম (V) এবং টাইটানিয়াম (Ti): নাইওবিয়াম, ভ্যানাডিয়াম এবং টাইটানিয়াম সবই দানা সূক্ষ্মকারী মৌল। এই মৌলগুলো যথাযথভাবে যোগ করলে ইস্পাতের কাঠামো উন্নত হয়, দানা সূক্ষ্ম হয় এবং ইস্পাতের শক্তি ও দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।